হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, তাঁর এমনই কিছু সংক্ষিপ্ত স্মৃতিচারণ ‘জারআয়ি আজ জারিয়া’ গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে সংকলিত হয়েছে। মরহুম আয়াতুল্লাহ আল-উজমা শুবাইরি জাঞ্জানির পিতা মরহুম আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আহমদ জাঞ্জানির সঙ্গে আয়াতুল্লাহ সৈয়দ জাওয়াদ খামেনেয়ির গভীর সম্পর্ক ছিল। সেই সূত্রে শুবাইরি জাঞ্জানিরও আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ির পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। তাঁর নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রায়ই আয়াতুল্লাহ সৈয়দ জাওয়াদ খামেনেয়ির বাড়িতে যেতেন। তাঁর পিতার সময় থেকেই এই সম্পর্ক বহু বছর ধরে বজায় ছিল।
শাহের ওয়াক্ফের সিল!
আমার মরহুম পিতার (আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আহমদ জাঞ্জানি) বইগুলোর মধ্যে ‘আওসাকুল ওয়াসায়েল’ নামে একটি বই ছিল। বইটি শাহ ছাপিয়েছিলেন এবং তাতে ওয়াক্ফের সিল লাগিয়ে আলেমদের দিয়েছিলেন। এখন সেই ‘আওসাকুল ওয়াসায়েল’-এর একটি কপি জনাব খামেনেয়ির কাছেও রয়েছে।
কেউ কেউ শাহের ওয়াক্ফের সিলটি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু আমি ও জনাব খামেনেয়ি তাতে কোনো হস্তক্ষেপ করিনি। কারণ, এটি ওয়াক্ফ করা হয়েছিল এবং অন্যান্য সুলতানের ওয়াক্ফের মতোই এর বৈধতা ছিল। এমনও নিশ্চিতভাবে বলা যেত না যে, অতীতের সুলতানরা আমাদের সময়ের শাহের তুলনায় বিশেষভাবে বেশি মর্যাদার অধিকারী ছিলেন।
সিলটিতে লেখা ছিল: মহামান্য সম্রাট, ইরানের শাহানশাহ মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির আদেশক্রমে, এই খণ্ডটি আরও ৭৪৯টি খণ্ডের সঙ্গে সম্মানিত আলেম ও তালাবাদের উপকার ও ব্যবহারের জন্য চিরস্থায়ীভাবে ওয়াক্ফ করা হলো। সেপাহবদ তেমুর বখতিয়ার, তেহরান-শাহরিভার ১৩৩৯।
স্নেহ ও সৌজন্যের প্রকাশ
জনাব খামেনেয়ি হাজ্জ আকা মুর্তাজার কাছে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি বলতেন, একবার আপনি আমাকে বলেছিলেন, ‘আয়াতুল্লাহ হায়েরি যদি রাতে শিক্ষা দেন, তাহলে আমিও তাতে অংশ নেব।’ আমি বিষয়টি আয়াতুল্লাহ হায়েরিকে জানিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘রাতে আমার সময় নেই’ অথবা ‘রাতে আমি পড়াতে পারি না। আর অমুকেরও আমার দারস-এর প্রয়োজন নেই।’
হাজ্জ আকা মুর্তাজা আমার প্রতি অত্যন্ত স্নেহ ও সৌজন্য প্রকাশ করতেন। মির্জা হাশেম আমোলি তাঁর কাছ থেকে আমার সম্পর্কে এমন কিছু বক্তব্যও বর্ণনা করতেন, যা এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই। তবে যে কথাটি বলতে কোনো অসুবিধা নেই তা হলো-কখনো তাঁর সঙ্গে আলোচনা দীর্ঘ হয়ে গেলে-কারণ তাঁর চিন্তাশক্তি ছিল অত্যন্ত গতিশীল-তিনি আমাকে বলতেন, ‘তোমার জন্য মির্জা শিরাজির দারস ভালো হবে।’ মির্জার দারস সাত ঘণ্টা পর্যন্ত চলত, কারণ তাঁর চিন্তাধারাও ছিল অত্যন্ত গতিশীল।
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রভাব
জনাব খামেনেয়ি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন। আমার ধারণা, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতি তাঁর এই গুরুত্বই হয়তো তাঁকে সন্ত্রাসী হামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। কারণ, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা আয়ু দীর্ঘ হওয়ার কারণ হয়।
তিনি তখন কোমে পড়াশোনা করছিলেন এবং নিয়মিত গুরুত্বের সঙ্গে দারস করছিলেন। তাঁর বাবা চোখের অস্ত্রোপচার করান। বাবার দেখাশোনা ও সহযোগিতার জন্য তিনি কোম ছেড়ে মাশহাদে চলে যান। অথচ স্বাভাবিকভাবেই, যে ব্যক্তি পড়াশোনার উদ্দেশ্যে কোমে এসেছেন, তাঁর জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না।
তিনি মাশহাদে বাবার সেবায় ছিলেন এবং প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা তাঁকে বই পড়ে শোনাতেন। অসম্ভব নয় যে, বাবার এই সেবা-যত্নই তাঁকে সন্ত্রাসী হামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার কারণ হয়েছিল।
প্রখর বোধশক্তি ও স্মৃতিশক্তির অধিকারী
জনাব খামেনেয়ি মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে এলে বলেন, ‘যখন ঠিক হয় যে আমি আপনাদের বাড়িতে আসব, তখন কয়েক দিন আগে থেকেই আমার মধ্যে এক ধরনের আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি হয়।’ অবশ্য আমাদের আলোচনাগুলো সাধারণত রাজনৈতিক নয়, বরং বৈজ্ঞানিক ও জ্ঞানভিত্তিক বিষয়েই হয়ে থাকে।
তিনি দ্রুত বিষয় বুঝতে পারেন এবং তাঁর স্মৃতিশক্তিও ভালো। যখনই জনাব খামেনেয়ির সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়, তাঁর নির্দেশে একটি রেকর্ডিং যন্ত্র রাখা হয়, যাতে আমাদের কথাবার্তা রেকর্ড করা যায়।
তিনি হাজ্জ শেখ মুর্তাজা হায়েরির ছাত্র ছিলেন। হাজ্জ শেখ মুর্তাজা তাঁর মেধা ও প্রতিভার প্রশংসা করতেন। তিনি আমার ভাই হাজ্জ আকা জাফরের সঙ্গেও একই বিষয়ে অধ্যয়ন ও আলোচনা করতেন। দ্রুত বিষয় অনুধাবন ও মেধার বিচারে তিনি হাজ্জ আকা জাফরের চেয়েও এগিয়ে ছিলেন।
সূত্র: জারআয়ি আজ দারিয়া (দরিয়া থেকে এক চুমুক), তৃতীয় খণ্ড, শিয়া গ্রন্থতত্ত্ব ইনস্টিটিউট।
আপনার কমেন্ট